কোনো দেশে জন্মানোর জন্য আমরা লাইনে দাঁড়াইনি, ফর্ম পূরণ করিনি, কিছু বেছে নিইনি। কোনো এক সকালে বা রাতে কোথাও চোখ মেলেছি, আর সেই মুহূর্ত থেকে জীবনের অনেক খুঁটিনাটি লেখা শুরু হয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদেরা কখনো কখনো একে "জন্মের লটারি" বলেন। এই লেখায় কয়েকটা নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে দেখার চেষ্টা করব, এই লটারির পুরস্কার আর লোকসান একে অপরের থেকে কত দূরে। সংখ্যাগুলো জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা সম্ভাবনা ২০২৪ আর বিশ্বব্যাংকের সূচকের ওপর ভিত্তি করে; সবই আনুমানিক, আর খেলার তথ্যে রাউন্ড করা রূপে আছে।

লটারি কি সত্যিই এলোমেলো?

কোন দেশে জন্মাবে, সেটা ভাগ্যের ব্যাপার, আর তার সম্ভাবনা সেই বছর সেই দেশে কত শিশু জন্মায় তার অনুপাতে। পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ শিশু জন্মায়। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ভারতে, প্রায় ৯০ লাখ চীনে আর প্রায় ৭৭ লাখ নাইজেরিয়ায়। বাংলাদেশে বছরে জন্মায় প্রায় ৩৪ লাখ শিশু, অর্থাৎ পৃথিবীর জন্মের প্রায় ২.৬ শতাংশ। তুরস্কে, যেখান থেকে এই প্রকল্পের শুরু, বছরে জন্ম প্রায় সাড়ে ৯ লাখ, মানে পৃথিবীর মোট জন্মের ১ শতাংশের একটু কম। ছক্কা ফেলে তুমি যদি এলোমেলো কোনো শিশু হতে, তবে জাপানে জন্মানোর সম্ভাবনা হতো প্রায় ০.৫ শতাংশ। আর চাদে জন্মানোর সম্ভাবনা প্রায় ০.৬ শতাংশ।

এই সংখ্যাগুলো দেখায় ভালো আর খারাপ ভাগ্য কীভাবে ছড়িয়ে আছে। পৃথিবীর বেশির ভাগ শিশু জন্মায় এমন দেশে, যেখানে গড় আয়ু কম আর মাথাপিছু আয় সীমিত। সবচেয়ে বেশি আয়ের হাতে গোনা কয়েকটা দেশে জন্মানো পরিসংখ্যানের দিক থেকে বিরল ঘটনা।

দুই প্রান্তের তুলনা: জাপান আর চাদ

খেলার তথ্য অনুযায়ী জাপানে জন্মানো শিশুর গড় আয়ু প্রায় ৮৪ বছর। চাদে প্রায় ৫৩ বছর। ফারাক ৩১ বছর, যা একজন মানুষের পুরো কর্মজীবনের চেয়েও লম্বা।

সূচকজাপানচাদ
জন্মের সময় গড় আয়ুপ্রায় ৮৪ বছরপ্রায় ৫৩ বছর
৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যু (প্রতি হাজারে)প্রায় ২প্রায় ১০৭
মাথাপিছু আয় (ক্রয়ক্ষমতা সমতা, ডলার)প্রায় ৫০,০০০প্রায় ১,৬০০
নগরায়ণপ্রায় ৯২ শতাংশপ্রায় ২৪ শতাংশ
নারীপ্রতি সন্তানপ্রায় ১.২প্রায় ৬.১

সবচেয়ে চমকে দেওয়া সারি শিশুমৃত্যুর। জাপানে প্রতি হাজার শিশুর প্রায় দুজন পাঁচ বছর বয়স দেখে না। চাদে দেখে না প্রায় একশো সাতজন, মানে প্রতি দশজনে একজন। প্রথম কয়েক বছরে এই দুই দেশের বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা একেবারে আলাদা। একজন ভাবছেন সন্তানের টিকার জন্য কোন হাসপাতাল বাছবেন, আরেকজন হয়তো হিসাব করছেন সন্তান সেই বয়সে আদৌ পৌঁছাবে কি না। আয়ের ফারাক পৌঁছায় প্রায় তিরিশ গুণে।

আরও কাছের তুলনা: তুরস্ক আর নাইজার

তুরস্কের মতো মধ্যম আয়ের দেশে জন্মানো শিশুর সুযোগ কি নাইজারে জন্মানো শিশুর চেয়ে আলাদা? তথ্য বলছে ফারাকটা বড়।

সূচকতুরস্কনাইজার
জন্মের সময় গড় আয়ুপ্রায় ৭৮ বছরপ্রায় ৬২ বছর
৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যু (প্রতি হাজারে)প্রায় ৯প্রায় ১১৫
মাথাপিছু আয় (ক্রয়ক্ষমতা সমতা, ডলার)প্রায় ৪১,০০০প্রায় ১,৫০০
নগরায়ণপ্রায় ৭৭ শতাংশপ্রায় ১৭ শতাংশ
নারীপ্রতি সন্তানপ্রায় ১.৫প্রায় ৬.১

গড় আয়ুর ফারাক ১৬ বছর। শিশুমৃত্যুর হার প্রায় তেরো গুণ। সবচেয়ে কম আয়ের দেশগুলোর একটির সঙ্গে তুলনা করলে মধ্যম আয়ের দেশে জন্মানোও বড় সুবিধা। তুলনার জন্য, বাংলাদেশে গড় আয়ু প্রায় ৭৪ বছর আর ৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যু প্রতি হাজারে প্রায় ২৭।

একই দেশেও সবাই একই তাস পায় না

দেশের গড় অনেক কিছু বলে, কিন্তু সবাইকে এক পাল্লায় মাপে না। একই দেশে জন্মানো দুটি শিশুর মধ্যেও বড় ফারাক থাকতে পারে। দুটি বিষয় বিশেষ করে চোখে পড়ে।

পরিবারের আয়

একই পাড়ায় জন্মানো দুটি শিশুর একজন হতে পারে গরিব পরিবারে, আরেকজন সচ্ছল পরিবারে। আয় প্রভাব ফেলে পুষ্টি, চিকিৎসার নাগাল, স্কুলে কত বছর টিকে থাকা যায় আর অসুখের সময় কী করা সম্ভব তার ওপর। খেলায় প্রতিটি চরিত্রের ১ থেকে ৫-এর মধ্যে একটা পারিবারিক আয়ের স্তর থাকে, আর এই স্তর গড় আয়ুকে দেশের গড়ের ওপরে বা নিচে টানে। প্রতি স্তরে প্রায় ১.৮ বছরের ফারাক যোগ হয়। এটা আসল ফারাকের সরল একটা আন্দাজ; বাস্তবে, বিশেষ করে বৈষম্য বেশি এমন দেশে, দুই প্রান্তের ফারাক অনেক বেশি হতে পারে।

শহর না গ্রাম

নগরায়ণের হার দেশভেদে অনেক বদলায়। জাপানে প্রায় ৯২ শতাংশ আর নাইজারে প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ শহরে থাকে। শহরে জন্মানো শিশু সাধারণত গ্রামের শিশুর চেয়ে স্কুল, হাসপাতাল আর বিশুদ্ধ পানির কাছাকাছি থাকে। বেশির ভাগ দেশে গ্রামে জন্মানো মানে লম্বা হাঁটা পথ, কম ডাক্তার আর কম সুযোগ। খেলায় প্রতিটি চরিত্র শহরে না গ্রামে জন্মাবে, তা ঠিক হয় দেশের শহুরে জনসংখ্যার অনুপাতে।

স্কুল আর আয়: সুযোগ কীভাবে জমতে থাকে?

স্বাস্থ্যের পর জন্মস্থান সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে শিক্ষায়। কম আয়ের দেশে কিছু শিশু পরিবারের কাজে হাত লাগাতে আগেভাগে স্কুল ছেড়ে দেয়। পানি টানা, খেতে কাজ করা, ছোট ভাইবোনদের দেখা এদের রোজকার কাজের মধ্যে পড়ে। স্কুলে কাটানো বছর যত কমে, পরে উপার্জনের সম্ভাবনাও তত কমে। আর আয় কমলে পরের প্রজন্মও একই চক্রে পড়তে পারে। এই শিকল প্রতিটি শিশুর বেলায় একইভাবে কাজ করে না; তবে দেশের পর্যায়ে তাকালে এর প্রভাব স্পষ্ট।

যে দেশে মাথাপিছু আয় প্রায় ৫০ হাজার ডলার আর যে দেশে প্রায় দেড় হাজার ডলার, তাদের মধ্যে বছরের ফারাক প্রায় তেত্রিশ গুণ। আয় একা কল্যাণ মাপে না, কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষকের বেতন আর অবকাঠামোর জন্য কতটা সম্পদ রাখা যাবে, তা ঠিক করে দেয়।

সংঘাত আর দুর্যোগও লটারির অংশ

জন্মস্থান ঠিক করে দেয় আরেকটা জিনিস: নিরাপত্তা। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জন্মানো হাসপাতালে পৌঁছানো, স্কুল খোলা থাকা আর পরিবার একসঙ্গে থাকাকে হুমকিতে ফেলে। বন্যা, খরা আর ঝড়ের মতো দুর্যোগও পৃথিবীর সব জায়গায় সমান আঘাত করে না। মজবুত অবকাঠামোর দেশ একই দুর্যোগ কম ক্ষতিতে সামলে নেয়। খেলায় সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জন্মানো চরিত্রদের যুদ্ধসংক্রান্ত ঘটনা বেশি ঘটে, আর খরা ও বন্যার মতো ঘটনা বেশি দেখা যায় কম আয়ের দেশে।

খেলা এটা কীভাবে দেখায়?

জন্মের লটারিতে ছক্কা ফেললে ৭০টি দেশের একটি বছরের জন্মসংখ্যা অনুযায়ী বেছে নেওয়া হয়। তারপর ঠিক হয় পরিবারের আয়ের স্তর, শহর না গ্রাম আর ভাইবোনের সংখ্যা। জীবন বয়ে চলার সময় মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রভাবিত হয় দেশের শিশুমৃত্যুর হার আর গড় আয়ু দিয়ে, আর স্কুলে যাওয়া ও কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা দেশের আয় দিয়ে। শেষে তোমার পাওয়া পয়েন্ট, কত বছর বাঁচলে আর জীবনের সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে মিলে দেখায়, ৫০০টি এলোমেলো জীবনের মধ্যে তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে।

এর সবই জেনেবুঝে সরল করা একটা মডেল। তবু মডেলটা চালালে খেয়াল করবে, একই সিদ্ধান্ত নেওয়া দুটি চরিত্র আলাদা দেশে খুব আলাদা ফলাফলে পৌঁছাতে পারে।

সংখ্যাগুলো আমাদের কী বলা উচিত?

এমন মানুষও আছেন যাঁরা একই দেশে, এমনকি একই পরিবারে জন্মে খুব আলাদা জীবন কাটিয়েছেন; ব্যক্তিগত চেষ্টার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু টেবিলগুলো এটাও পরিষ্কার দেখায় যে শুরুর দাগ সবার জন্য এক জায়গায় নেই। এটা জানলে নিজের ভাগ্য আরও স্পষ্ট দেখতে আর অন্যদের অবস্থা আরও ভালো বুঝতে সুবিধা হয়।

দেশে দেশে ফারাকের কারণ জানতে ইচ্ছে হলে সেই লেখাটা দেখো, যেখানে বলা হয়েছে গড় আয়ু কেন এত আলাদা হয়। নিজে ছক্কা ফেলতে চাইলে খেলায় গিয়ে নিজের লটারি টানো।