"জাপানের মানুষ গড়ে ৮৪ বছর বাঁচে", এই কথাটা আমরা প্রায়ই শুনি। কথাটা ঠিক, কিন্তু বেশির ভাগ সময় ভুল বোঝা হয়। এই সংখ্যা বলছে না যে প্রত্যেক জাপানি ৮৪ বছর পর্যন্ত বাঁচে। কেউ মারা যায় ৬০-এ, কেউ ১০০-তে। তাহলে এই সংখ্যা ঠিক কী মাপে, আর দেশগুলোর মধ্যে ফারাক এত বড় কেন? এই লেখায় ধারণাটা সহজ করে ফারাকের কারণগুলো দেখব। সংখ্যাগুলো জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা সম্ভাবনা ২০২৪ আর বিশ্বব্যাংকের তথ্য থেকে নেওয়া আনুমানিক মান।

জন্মের সময় গড় আয়ু কী মাপে?

জন্মের সময় গড় আয়ু একটা হিসাব, যা দেখায় কোনো এক বছরে জন্মানো শিশুরা গড়ে কত বছর বাঁচবে, যদি ধরে নিই সেই বছরের মৃত্যুহার তাদের সারা জীবন একই থাকবে। মানে এটা ভবিষ্যদ্বাণী নয়, নির্দিষ্ট একটা বছরের মৃত্যু সারণি থেকে বের করা সারসংক্ষেপ। বাস্তবে চিকিৎসা এগোয়, মৃত্যুহার কমে; আজ জন্মানো শিশু প্রায়ই সেই সংখ্যার চেয়ে বেশি বাঁচে।

আরেকটা জরুরি কথা: এটা গড়, সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া বয়স বা মাঝের বয়স নয়। আর গড়ের ওপর খুব অল্প বয়সের মৃত্যুর প্রভাব অনেক বেশি।

শিশুমৃত্যু গড়কে কীভাবে নামিয়ে দেয়?

একটা সহজ উদাহরণ ভাবা যাক। এই সংখ্যাগুলো কাল্পনিক, শুধু যুক্তিটা দেখানোর জন্য। ধরো একশো জনের একটা দলের দশজন এক বছর বয়সে মারা গেল, আর নব্বইজন সত্তর বছর পর্যন্ত বাঁচল। (১০ × ১ + ৯০ × ৭০) / ১০০ হিসাব থেকে গড় আসে প্রায় ৬৩ বছর। একই দলে কেউ শিশুকালে না মারা গেলে গড় হতো ৭০। দশজনের অকালমৃত্যু গড়কে প্রায় সাত বছর নামিয়ে দিল।

আসল পৃথিবীতেও অবস্থা প্রায় একই। চাদে ৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যুহার প্রতি হাজারে প্রায় ১০৭, জাপানে প্রতি হাজারে প্রায় ২। চাদের গড় আয়ু প্রায় ৫৩, জাপানের প্রায় ৮৪। এই ফারাকের বড় অংশ আসে শৈশব আর শিশুকালের মৃত্যু থেকে। চাদে কেউ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলে তার প্রত্যাশিত মোট আয়ু জন্মের সময়ের সংখ্যার চেয়ে বেশ লম্বা। তাই "ওই দেশে কেউ ৫০ পেরোয় না" বলা ভুল; আসল সমস্যা হলো অনেক শিশুকে প্রথম কয়েক বছরেই হারাতে হয়।

সবচেয়ে বেশি আর সবচেয়ে কম গড় আয়ু

খেলার তথ্যে থাকা ৭০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর সবচেয়ে কম মানগুলো এ রকম (আনুমানিক, বছরে):

সবচেয়ে বেশিবছরসবচেয়ে কমবছর
হংকং৮৫চাদ৫৩
জাপান৮৪নাইজেরিয়া৫৪
দক্ষিণ কোরিয়া৮৪সোমালিয়া৫৬
সুইজারল্যান্ড৮৪আইভরি কোস্ট৫৯
ফ্রান্স৮৩মোজাম্বিক৬০
ইতালি৮৩বুরকিনা ফাসো৬০

এই তালিকায় তুরস্ক প্রায় ৭৮ বছর নিয়ে মাঝের ওপরের দিকে, আর বাংলাদেশ প্রায় ৭৪ বছর নিয়ে তার একটু নিচে। দুই প্রান্তের মধ্যে ৩০ বছরের বেশি দূরত্ব।

ফারাক এত বড় কেন?

একটা মাত্র কারণ নেই; কয়েকটা বিষয় আছে যারা একে অপরকে বাড়িয়ে তোলে।

চিকিৎসার নাগাল

প্রসবের সময় একজন ধাত্রী বা ডাক্তারের থাকা, অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সংক্রমণের চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের নিয়মিত দেখভাল, এসব আয়ু স্পষ্টভাবে বাড়ায়। গ্রামে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব এই নাগাল কঠিন করে তোলে।

টিকা

হাম, ধনুষ্টংকার আর পোলিওর মতো রোগের টিকা শিশুমৃত্যু অনেক কমিয়েছে। টিকাদানের ফলে গুটিবসন্ত ১৯৮০ সালে পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচি কতটা ব্যাপকভাবে চলে, তাতে এখনো দেশে দেশে ফারাক আছে।

বিশুদ্ধ পানি আর পুষ্টি

দূষিত পানি ডায়রিয়া আর অন্যান্য সংক্রামক রোগ ছড়ানোর সবচেয়ে বড় পথগুলোর একটা। অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে আর রোগের প্রাণঘাতী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশুদ্ধ পানি আর নিয়মিত খাবারের নাগালে দেশে দেশে বিরাট ফারাক।

আয়

বেশি আয় মানে ভালো পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, বাসস্থান আর চিকিৎসায় বেশি খরচ। খেলার তথ্যে দেশগুলোর মাথাপিছু আয় আর গড় আয়ু সাধারণভাবে একসঙ্গে বাড়ে: তথ্যে যে আটটি দেশের মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ডলার বা তার কম (চাদ, সোমালিয়া, মোজাম্বিক, নাইজার, গণতান্ত্রিক কঙ্গো, মাদাগাস্কার, ইয়েমেন, আফগানিস্তান), তাদের সবকটিতে গড় আয়ু ৬৫ বছর বা তার কম। তবে সম্পর্কটা সরলরৈখিক নয়; আয়ের একটা স্তরের পর বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়। আবার কিছু মধ্যম আয়ের দেশ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ করে আয় অনুযায়ী যতটা আশা করা যেত তার চেয়ে বেশি গড় আয়ুতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ এর একটা পরিচিত উদাহরণ: মাথাপিছু আয় প্রায় ৯ হাজার ডলার, অথচ গড় আয়ু প্রায় ৭৪ বছর।

সংঘাত আর অস্থিরতা

যুদ্ধ শুধু সরাসরি মৃত্যু ঘটায় না। হাসপাতাল, স্কুল আর খাদ্য সরবরাহও ভেঙে দেয়। তথ্যে সংঘাতপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোতে (যেমন সোমালিয়া, মালি, ইয়েমেন, আফগানিস্তান) গড় আয়ু প্রায় ৫৬ থেকে ৬৭ বছরের মধ্যে, মানে কয়েকটি উচ্চ আয়ের দেশের চেয়ে অনেক নিচে।

ঐতিহাসিক বৃদ্ধি: দুশো বছরের গল্প

মানব ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় গড় আয়ু আজকের চেয়ে অনেক কম ছিল। হিসাব বলছে, খুব বেশি দিন আগেও জন্মের সময় গড় আয়ু ছিল তিরিশ বা চল্লিশের কোঠায়। এর মূল কারণ, আজ টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগে তখন বহু শিশু মারা যেত। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী ১৯৫০ সালে বিশ্বের গড় ছিল প্রায় ৪৬ বছর, আজ তা বেড়ে প্রায় ৭৩ বছর। অর্ধশতাব্দীর একটু বেশি সময়ে গড়ে ২৭ বছর যোগ হয়েছে।

এই বৃদ্ধির বেশির ভাগ এসেছে শিশুমৃত্যু কমার ফলে। আজ উচ্চ আয়ের দেশে বার্ধক্যের অগ্রগতি (হৃদরোগ আর ক্যানসারের চিকিৎসা) গড়কে ধীরে বাড়ায়; অন্যদিকে কম আয়ের দেশে শৈশব পার করতে পারাই এখনো বড় লাভ এনে দেয়। তাই আজকের বড় ফারাক কমানোর পথ সবার আগে অল্প বয়সের মৃত্যু কমানো।

গড় আয়ু আর জীবনকাল এক জিনিস নয়

এই দুটো ধারণা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়। জীবনকাল হলো একজন মানুষ আসলে যত বছর বেঁচেছেন। গড় আয়ু একটা দলের জন্য হিসাব করা গড়, যা সবাই মারা যাওয়ার পরই চূড়ান্ত হয়। তা ছাড়া প্রত্যাশিত আয়ু প্রতিটি বয়সে নতুন করে হিসাব করা যায়: ৬৫ বছরে পৌঁছানো কারও বাকি প্রত্যাশিত আয়ু জন্মের সময়ের প্রত্যাশা থেকে আলাদা, কারণ তিনি শৈশবের ঝুঁকি অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছেন। এ কারণেই কম গড় আয়ুর দেশেও অনেকে ৮০ বছর দেখেন; শুধু তাঁদের অনুপাত কম।

আরেকটা পার্থক্য সুস্থ জীবনকাল নিয়ে। বেশি দিন বাঁচা মানেই সেই বছরগুলো সুস্থ কেটেছে, তা নয়। কিছু দেশ আয়ু বাড়াতে খুব সফল, কিন্তু শেষ বছরগুলোর একটা অংশ কাটে অসুখে। খেলার স্বাস্থ্য সূচক এই সূক্ষ্ম ব্যাপারটা খুব মোটা দাগে দেখায়।

খেলায় গড় আয়ু কীভাবে ব্যবহার হয়?

জন্মের লটারিতে প্রতিটি দেশের গড় আয়ু ব্যবহার হয় সেই বক্ররেখা মেলাতে, যা চরিত্রের আয়ু ঠিক করে। পরিবারের আয়ের স্তরও প্রত্যাশাকে একটু ওপরে বা নিচে টানে। শৈশব আর প্রথম শৈশবে মৃত্যুর সম্ভাবনা সরাসরি ঠিক হয় দেশের ৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যুহার অনুযায়ী। ফলাফলের পর্দায় তোমার চরিত্রের আয়ু দেশের গড়ের পাশাপাশি দেখতে পাও। কখনো গড়ের অনেক বেশি বাঁচো, কখনো অনেক কম। গড় যে প্রত্যেক মানুষের নিয়তি নয়, এটা তার ছোট্ট একটা মনে করিয়ে দেওয়া।

জন্মের মোট প্রভাব জীবনে কতটা, জানতে চাইলে জন্মের লটারি লেখাটা একবার দেখো। নিজের জীবন যাচাই করতে খেলায় ফেরো।