জন্মের লটারি একটা খেলা, কিন্তু এর পেছনে আসল তথ্যে চলা একটা ছোট মডেল আছে। এই লেখায় সহজ ভাষায় বলছি মডেলটা কীভাবে গড়া: দেশ কীভাবে বাছা হয়, মৃত্যুর সম্ভাবনা কোথা থেকে আসে, ঘটনা আর সিদ্ধান্ত কীভাবে কাজ করে, পয়েন্ট আর পার্সেন্টাইল কীভাবে হিসাব হয়। শেষে মডেলটা জেনেবুঝে যেসব সরলীকরণ করে সেগুলোও খোলাখুলি লিখেছি, কারণ মডেল কী করে না তা জানাও তাকে বোঝার অংশ।

১. তথ্যভান্ডার

খেলায় ৭০টি দেশ আছে। প্রতিটি দেশের জন্য এই মানগুলো ব্যবহার করি: বছরে জন্মসংখ্যা, জন্মের সময় গড় আয়ু, প্রজনন হার (জাতিসংঘ বিশ্ব জনসংখ্যা সম্ভাবনা ২০২৪), মাথাপিছু আয় (ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুযায়ী), ৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যুহার আর শহুরে জনসংখ্যার অনুপাত (বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব উন্নয়ন সূচক)। মানগুলো মোটামুটি ২০২২-২০২৩ সালের, আর আনুমানিক, রাউন্ড করে বসানো। কিছু দেশকে "সংঘাতপূর্ণ এলাকা" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; এই চিহ্ন যুদ্ধসংক্রান্ত ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ায়। তালিকার ৭০টি দেশ পৃথিবীর বেশির ভাগ জন্ম ধরে, সব নয়: তথ্যে বছরে জন্মের যোগফল প্রায় ১১ কোটি ৬০ লাখ, আর পৃথিবীর মোট প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ।

২. জন্মের লটারি টানা

ছক্কা ফেললে প্রোগ্রাম তালিকার দেশগুলোর বছরের জন্মসংখ্যা পাশাপাশি সাজিয়ে একটা এলোমেলো বিন্দু বাছে। যে দেশে জন্ম বেশি, সে এই রেখার বড় অংশ জুড়ে থাকে। তাই ভারতে জন্মানোর সম্ভাবনা তালিকার মোট জন্মের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ, মানে প্রায় ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে জন্মানোর সম্ভাবনা প্রায় ২.৯ শতাংশ, তুরস্কে প্রায় ০.৮ শতাংশ, জাপানে প্রায় ০.৬ শতাংশ, চাদে প্রায় ০.৬ শতাংশ। মূল পাতার "এখন জন্মালে" তালিকা এই অনুপাতে সবচেয়ে সম্ভাব্য আটটি দেশ দেখায়।

দেশ বাছার পর শুরুর অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো ঠিক হয়:

  • লিঙ্গ: প্রায় ৫১ শতাংশ ছেলে, ৪৯ শতাংশ মেয়ে।
  • পরিবারের আয়ের স্তর: ১ (গরিব) থেকে ৫ (সচ্ছল), সমান সম্ভাবনায়।
  • শহর না গ্রাম: দেশের শহুরে জনসংখ্যার অনুপাতে।
  • ভাইবোনের সংখ্যা: দেশের প্রজনন হার অনুযায়ী। চাদে ভাইবোন প্রায়ই বেশি, দক্ষিণ কোরিয়ায় কম।
  • মায়ের বয়স: ১৮ থেকে ৩২-এর মধ্যে এলোমেলো।

পুরো লটারিটা আসে একটা সিড মান থেকে। একই সিডে শুরু হওয়া দুটি খেলা একই মানুষ তৈরি করে; চ্যালেঞ্জ আর "আজকের জীবন" এভাবেই কাজ করে। বন্ধু লিংক খুললে সে একই দেশে, একই পরিবারে, একই সংখ্যক ভাইবোন নিয়ে জন্মায়। পার্থক্য আসে তার পরের সিদ্ধান্তগুলো থেকে।

৩. মৃত্যুর সম্ভাবনা

মৃত্যুর সম্ভাবনা দুই অংশে গড়া।

শৈশব: আসল মৃত্যুহার থেকে

প্রথম বছরে মৃত্যুর সম্ভাবনা দেশের ৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যুহারের প্রায় ৭২ শতাংশ। চাদে এটা প্রতি হাজারে প্রায় ৭৭, মানে প্রায় ৭.৭ শতাংশ। এক থেকে চার বছর বয়সের মধ্যে প্রতি বছরের মৃত্যুর সম্ভাবনা ধরা হয় ৫ বছরের কম বয়সে মৃত্যুহারের প্রায় ৭ শতাংশ; চাদে এটা দাঁড়ায় বছরে প্রতি হাজারে প্রায় ৭.৫। এই ভাগ একটা সরল পদ্ধতি, যার ভিত্তি এই বাস্তবতা যে শিশুমৃত্যুর বড় অংশই নবজাতক ও এক বছরের কম বয়সে। জাপানের মতো দেশে, যেখানে শিশুমৃত্যু খুব কম, এই বছরগুলো প্রায় ঝুঁকিহীন।

প্রাপ্তবয়স: গমপার্টজ বক্ররেখা

পাঁচ বছরের পর মৃত্যুর সম্ভাবনা ঠিক হয় গমপার্টজ বক্ররেখা নামের একটা সূত্রে। মানুষের মৃত্যুর হিসাবে বহু দিন ধরে ব্যবহৃত এই সূত্রের ভাবনা সোজা: বয়সের সঙ্গে মৃত্যুর ঝুঁকি গুণোত্তর হারে বাড়ে। কম বয়সে ঝুঁকি খুব কম, বয়স বাড়লে দ্রুত বাড়ে। বক্ররেখার দুটি সেটিং আছে: বৃদ্ধির গতি স্থির রাখা হয়েছে, আর শুরুর বিন্দু দেশের গড় আয়ু অনুযায়ী সরানো হয়। লক্ষ্য গড় আয়ু হিসাব হয় দেশের গড় আয়ুর সঙ্গে পরিবারের আয়ের স্তরের প্রভাব (প্রতি স্তরে প্রায় ১.৮ বছর) আর ছোট একটা সংশোধন যোগ করে। এভাবে জাপানে জন্মানো চরিত্রদের আয়ু গড়ে প্রায় ৮৪ বছরের কাছাকাছি, আর চাদের চরিত্রদের অনেক নিচে বসে। তবু বক্ররেখা এলোমেলো; কিছু চরিত্র গড়ের অনেক বেশি বাঁচে, কিছু অনেক কম।

মৃত্যুর কারণগুলো (সড়ক দুর্ঘটনা, হার্ট অ্যাটাক, ঘুমের মধ্যে মৃত্যু ইত্যাদি) বয়স অনুযায়ী বাছা কাল্পনিক বর্ণনা; মৃত্যুর কারণের আসল বণ্টন দেখায় না।

৪. ঘটনা

প্রতি বছর চরিত্রের বয়স আর অবস্থার সঙ্গে মানানসই ঘটনার জন্য একটা সম্ভাবনা যাচাই চলে। কিছু ঘটনা সবার জন্য এক (প্রথম পা ফেলা, প্রথম শব্দ), কিছু নির্ভর করে দেশ আর পরিবারের ওপর:

  • উচ্চ জ্বরের অসুখের সম্ভাবনা দেশের শিশুমৃত্যুর হারের সঙ্গে বাড়ে।
  • টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা দেশের উন্নয়নের স্তরের ওপর নির্ভর করে।
  • দুর্ভিক্ষ আর পানি টানার ঘটনা আসে গরিব পরিবারে আর কম আয়ের দেশের গ্রামাঞ্চলে।
  • পদোন্নতি, চাকরি হারানো, বাড়ি কেনার মতো ঘটনা নির্ভর করে কাজ থাকা আর সম্পদের স্তরের ওপর।
  • সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জন্মানো চরিত্রদের যুদ্ধের ঘটনা ঘটতে পারে।

স্কুলে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আর অবসরের মতো মাইলফলকও আকার পায় দেশের মাথাপিছু আয় আর পরিবারের আয়ের স্তর অনুযায়ী। এভাবে একই দেশে জন্মানো গরিব শিশু আর সচ্ছল শিশু আলাদা পথে যেতে পারে। ঘটনার বর্ণনা কাল্পনিক; কোনো আসল মানুষের নয়।

৫. সিদ্ধান্ত

জীবনের সাতটি জায়গায় সিদ্ধান্ত তোমার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়: টিফিনের ছুটিতে কী করবে, স্কুলের পরের পথ, বিদেশে যাওয়া, বিয়ে, ঝুঁকির চাকরির প্রস্তাব, স্বাস্থ্যের সতর্কবার্তা আর বার্ধক্যের অবসর সময়। তোমার বাছাই স্বাস্থ্য, সুখ, জ্ঞান, ভালোবাসা আর সম্পদ, এই পাঁচ সূচকে ছোট প্রভাব ফেলে। ঝুঁকির চাকরির প্রস্তাবের মতো কিছু সিদ্ধান্তে ফল তবু সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে। "অটো" বোতাম এই সিদ্ধান্তগুলো এলোমেলোভাবে নেয়। একবার ফলাফল দেখার পর "একই শুরু থেকে আবার" বোতাম দিয়ে অন্য বাছাই চেষ্টা করে দেখতে পারো।

৬. পয়েন্ট আর পার্সেন্টাইল

জীবন শেষ হলে পয়েন্ট হিসাব হয় এই অংশগুলো থেকে: কত বছর বাঁচলে (সবচেয়ে বেশি ভার), সারা জীবনের গড় সুখ, ভালোবাসা, জ্ঞান, সম্পদ আর স্বাস্থ্যের স্তর, আর অর্জিত ব্যাজ। পয়েন্টের একা কোনো মানে নেই, তাই পাশে একটা পার্সেন্টাইল জোড়া হয়: প্রথমবার ফলাফলের পর্দায় এলে প্রোগ্রাম পেছনে একবার ৫০০টি এলোমেলো জীবন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সিমুলেট করে, আর তোমার পয়েন্টকে এই ৫০০ জীবনের মধ্যে সাজায়। "৮০ শতাংশ জীবনের চেয়ে ভালো" মানে সেই ৫০০ জীবনের প্রায় ৮০ শতাংশ তোমার চেয়ে কম পয়েন্ট পেয়েছে।

এই ৫০০ জীবনও একই লটারিতে তৈরি বলে পার্সেন্টাইল পৃথিবীর একটা আসল টুকরোর মতো আচরণ করে: দীর্ঘ আয়ুর দেশে জন্মানোরা সাধারণত ওপরের পার্সেন্টাইলে, আর শিশুমৃত্যু বেশি এমন দেশে জন্মানোরা নিচের পার্সেন্টাইলে থাকে। তা ছাড়া ৫০০ জীবন ছোট একটা নমুনা; পার্সেন্টাইল কয়েক পয়েন্ট ওঠানামা করতে পারে।

সীমাবদ্ধতা আর জেনেবুঝে করা সরলীকরণ

  • দেশের গড়। মডেল প্রতিটি দেশকে একটা মাত্র মান দিয়ে দেখায়। বাস্তবে একই দেশের ভেতরে অঞ্চল, জাতিগোষ্ঠী আর শ্রেণির মধ্যে বড় ফারাক থাকে।
  • ৭০টি দেশ। পৃথিবীর প্রায় ১৯৫টি দেশের মধ্যে শুধু ৭০টি তালিকায়। ছোট দেশগুলো বাদ পড়েছে।
  • স্থির সময়। গড় আয়ু ধরে নেয় আজকের মৃত্যুহার সারা জীবন একই থাকবে। বাস্তবে চিকিৎসা এগোয়, দেশও বদলায়।
  • ঘটনার সম্ভাবনা। ঘটনাগুলোর বছরের সম্ভাবনা এই খেলার জন্য বেছে নেওয়া আনুমানিক মান; আসল জীবনের পূর্ণ পরিসংখ্যান নয়।
  • কল্পনা। নাম, ঘটনার বর্ণনা, মৃত্যুর কারণ আর ব্যাজ লেখা হয়েছে বিনোদন আর গল্পের জন্য।
  • পয়েন্ট। পয়েন্ট দেওয়ার পেছনে একটা মূল্যবিচার আছে: দীর্ঘ আয়ু আর সুখকে "ভালো জীবন" ধরা হয়েছে। সবাই ভালো জীবনকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেন না।

মোটকথা, মডেলটা জন্মস্থানের প্রভাব দেখানো একটা রেখাচিত্র, ফটোগ্রাফ নয়। এই রেখাচিত্রের উদ্দেশ্য, কোনো দেশের গড়ের পেছনের ফারাকগুলো তুমি যেন অনুভব করতে পারো। আসল তথ্যের জন্য জাতিসংঘ WPP 2024 আর বিশ্বব্যাংকের উন্মুক্ত তথ্য পোর্টালই সবচেয়ে ভালো শুরু।

তথ্য নিজে আর দেশে দেশে ফারাক নিয়ে আগ্রহ থাকলে গড় আয়ুর লেখাটা পড়ো। তৈরি থাকলে ছক্কা ফেলো।